প্রিয় মানুষটিকে নিয়ে বিয়ের পর ঘুরতে যাওয়ার ইচ্ছা সবারই হয়। ‘হানিমুন’ যাকে বাংলায় বলা হয় ‘মধুচন্দ্রিমা’। কিন্তু এই মধুচন্দ্রিমায় কোথায় যাবেন এ নিয়ে পড়তে হয় নানাবিধ সমস্যায়। কোথায় যাবেন? হানিমুনটা দেশেই করবেন নাকি দেশের বাইরে? পুরোটাই নির্ভর করে নিজের ইচ্ছে ও সামর্থের উপর। অনেকেই হানিমুন করতে বিদেশে গমন করেন। কিন্তু আমাদের দেশেই এমন কিছু আকর্ষণীয় জায়গা রয়েছে যেখানে আপনি আপনার হানিমুন করতে যেতে পারেন। এখানে বাংলাদেশে অবস্থিত এমন কিছু স্থান নিয়েই আলোচনা করবো।

 

কক্সবাজার

চট্টগ্রাম বিভাগের অন্তর্গত একটি জেলা হচ্ছে কক্সবাজার। এটি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্হিত।  কক্সবাজার চট্টগ্রাম থেকে ১৫২ কিঃমিঃ দক্ষিণে অবস্হিত। ঢাকা থেকে কক্সবাজার এর দূরত্ব ৪১৪ কি.মি.। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজারে অবস্থিত। কক্সবাজার গেলে দিনের যেকোন সময় সমুদ্রতীরে বেড়াতে আপনার মন চাইবে। বালুর নরম বিছানা, সারি সারি ঝাউবন, সামনে বিশাল সমুদ্র এর দেখা পেতে হলে আপনাকে যেতে হবে কক্সবাজার ।

কক্সবাজার থেকে ১২ থেকে ২২ কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যেই রয়েছে আরো দুটি পর্যটন স্থান। একটি হলো ইনানী এবং অন্যটি হলো হিমছড়ি । কক্সবাজার থেকে ২২ কিলোমিটার দূরে রয়েছে আকর্ষণীয় সমুদ্র সৈকত ইনানী । আর এই সৈকতে যাওয়ার পথেই পাওয়া যাবে আরেক আকর্ষণীয় পর্যটন স্থান হিমছড়ি।

বিশ্বের সর্ববৃহৎ বিচ কক্সবাজারে রয়েছে আন্তর্জাতিকমানের বেশ কয়েকটি হোটেল ও রিসোর্ট। এছাড়াও সরকারি এবং ব্যক্তিগত মালিকানায় এখানে ছোট বড় বিভিন্ন মানের অনেক রিসোর্ট, হোটেল ও বোর্ডিং হাউস গড়ে উঠেছে ।

হানিমুনের জন্য বাংলাদেশের মধ্যে কক্সবাজার সবচেয়ে জনপ্রিয় স্পট।

 

 

 

সেন্ট মার্টিনস

 

হানিমুনে আপনি সেন্টমার্টিন থেকেও ঘুরে আসতে পারেন। সেন্টমার্টিন বাংলাদেশের সীমানার সর্ব দক্ষিণে অবস্থিত।  কক্সবাজার জেলার টেকনাফ উপজেলা থেকে সেন্টমার্টিন ৯ কিমি দক্ষিণে গড়ে ওঠা একটি ছোট দ্বীপ। ভ্রমণ পিপাসু মানুষদের অবসর সময় কাটানোর জন্যে এবং পরিবারের সাথে একান্তে সময় কাটানোর জন্যে আদর্শ জায়গা হচ্ছে এই সেন্টমার্টিন দ্বীপ। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার পর্যটক সেন্টমার্টিন দ্বীপে ঘুরতে আসেন। সেন্টমার্টিন দ্বীপে থাকার জন্যে উন্নতমানের বেশ কয়েকটি হোটেল ও কটেজ রয়েছে। আপনি আপনার পছন্দ মত যেকোন হোটেলেই থাকতে পারেন। তবে পর্যটন মৌসুমে সেন্টমার্টিন দ্বীপে আসার আগেই কোন হোটেল বা কটেজে আপনি বুকিং দিয়ে রাখতে পারেন। নাহলে আপনি হয়ত তখন কোথাও থাকার জায়গা নাও পেতে পারেন। কারণ পর্যটন মৌসুমে প্রচুর পরিমাণে জনসাধারণের সমাগম ঘটে সেন্টমার্টিন দ্বীপে।

 

 

 

বান্দরবান

মেঘ ছুঁয়ে দেখার ইচ্ছে যদি আপনি মনের মধ্যে ধারণ করে থাকেন তবে হানিমুনে ঘুরে আসতে পারেন বান্দরবান  থেকে। চট্টগ্রাম থেকে ৭৫ কিলোমিটার দূরে বান্দরবান। পাহাড়ের বুকে ভাসতে থাকা মেঘের খেলা দেখতে আর প্রিয়জনের সঙ্গে সুন্দর সময় কাটাতে চাইলে যেতে পারেন সেখানে। বান্দরবানে ঘুরে বেড়ানোর মত অনেক জায়গা রয়েছে। যেমন- তাজিংডং, কেওক্রাডং, নীলাচল, নীলগিরি, মেঘলা পর্যটন কেন্দ্র, নাফাখুম জলপ্রপাত, বগা লেক, বুদ্ধ ধাতু জাদি, চিম্বুক পাহাড়, রেমাক্রী, শৈলপ্রপাত, প্রান্তিক লেক, স্বর্ণমন্দির, চিংড়ি ঝর্ণা, লামা ইত্যাদি।

রাঙামাটি

 

মধুচন্দ্রিমার আরো একটি গন্তব্য হতে পারে রাঙামাটি। চারিদিকে শুধু সবুজের সমারোহ আর পাহাড়ঘেড়া এ জেলাতেই রয়েছে এশিয়ার বৃহত্তম কৃত্রিম হ্রদ কাপ্তাই হ্রদ। রাঙ্গামাটি জেলা তার বৈচিত্রময়তার জন্যে আকর্ষণীয় স্থান হিসাবে দেশী-বিদেশী পর্যটকদের মনে আলাদাভাবে স্থান করে নিয়েছে। এখানকার কাপ্তাই লেক, ঝুলন্ত সেতু আপনার হানিমুনকে আরো মধুর করে তুলবে। থাকার জন্য পর্যটন করপোরেশনের মোটেলসহ আরো বেশ কিছু  রিসোর্ট রয়েছে।

 

 

সুন্দরবন

 

বঙ্গোপসাগরের উপকূলবর্তী প্রশস্ত বনভূমি সুন্দরবন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্যে ভরপুর। প্রায় ছয় হাজার সতেরো বর্গকিলোমিটার আয়তন বিশিষ্ট বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট এই সুন্দরবন। আপনার হানিমুনে আপনি সুন্দরবন থেকে ঘুরে আসতে পারেন।

 

 

নিঝুম দ্বীপ ন্যাশনাল পার্ক – হাতিয়া

 

শহরের ব্যস্ত জীবন থেকে মুক্তিলাভের জন্য যদি প্রকৃতির ভূস্বর্গে আপনি হারিয়ে যেতে চান। তবে হানিমুন করতে যেতে পারেন নিঝুম দ্বীপ। চারদিকে গাছপালা আর ঘন জংগল পরিবেষ্টিত প্রকৃতির এক অপরূপ সুন্দর দ্বীপ হচ্ছে এই নিঝুম দ্বীপ । শীতকালে বিভিন্ন দেশ থেকে হাজারো অতিথি পাখির এক মিলনমেলা বসে এখানে। নিঝুম দ্বীপ নোয়াখালী জেলার হাতিয়া উপজেলায় অবস্থিত। নিঝুম দ্বীপে কোন হিংস্র প্রাণি নেই এখানে সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায় হরিণ ও মহিষ। বাংলাদেশের প্রকৃতির বিস্ময়কর সুন্দর রূপ দেখার জন্য এখানে আসতেই পারেন।

 

 

 

চট্টগ্রাম

 

হানিমুন কাটানোর আরেকটি জায়গা হতে পারে চট্টগ্রাম। সমুদ্র, উপত্যকা,পাহাড়,  বন‌ এসবের কারণে চট্টগ্রামের মতো ভৌগোলিক বৈচিত্র বাংলাদেশে অন্য আর কোন জেলার নেই। পর্যটন নগরী চট্টগ্রামে ঘুরে বেড়ানোর জন্যে অনেকগুলো জায়গা রয়েছে। আপনি চট্টগ্রামে হানিমুন কাটানোর সময় ঘুরে আসতে পারেন খইয়্যাছড়া, পতেঙ্গা সি-বীচ, চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানা, ফয়েজ লেক, ফয়েজলেক সী ওয়ার্ল্ড, বাটালি পাহাড় বা জিলাপী পাহাড়, জিয়া পার্ক বা স্বাধীনতা কমপ্লেক্স, কমনওয়েলথ ওয়ার সিমেট্রী, নেভাল একাডেমি চট্টগ্রাম, বাটারফ্লাই পার্ক এসব জায়গা থেকে। তাছাড়া চট্টগ্রামে থাকার জন্যে মানসম্পন্ন বিভিন্ন আবাসিক হোটেল ও রয়েছে।

 

 

সিলেট

 

আপনার মধুচন্দ্রিমার আরো একটি গন্তব্য হতে পারে দুটি পাতা আর একটি কুঁড়ির দেশ সিলেট। সিলেটে ঘুরাফেরা করে বেড়ানোর মত অনেক সুন্দর সুন্দর স্থান রয়েছে। সিলেটে হানিমুন পালন করতে এসে ঘুরে আসতে পারেন জাফলং, বিছনাকান্দি, জৈন্তা রাজবাড়ি অথবা রাতারগুল থেকে। সিলেটে ঘুরতে পারেন  হাছন রাজা যাদুঘর,মালনী ছড়া চা বাগান, হাকালুকি হাওড়, লালাখাল সিলেটে গিয়ে জিয়ারত করে আসতে পারেন হযরত শাহজালাল(রাঃ) ও হযরত শাহ পরাণ(রাঃ) এর মাজার শরীফ থেকে। এমনকি ঘুরে আসতে পারেন চায়ের দেশ শ্রীমঙ্গল থেকেও। এখানকার চা বাগান ছাড়াও ঘুরে বেড়াতে পারেন মাধব কুন্ড, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, ইত্যাদি জায়গায়। পর্যটকদের কথা মাথায় রেখে সিলেটে বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক মানের রিসোর্ট গড়ে তোলা হয়েছে।

 

 

 

 

 

কুয়াকাটা

 

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি সমুদ্র সৈকত ও পর্যটনকেন্দ্র হচ্ছে কুয়াকাটা। আপনার মধুচন্দ্রিমার আরো একটি গন্তব্য হতে পারে এই কুয়াকাটা। কুয়াকাটা বাংলাদেশের একমাত্র সৈকত যে জায়গা থেকে সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত দুটোই দেখা যায়। দেশ বিদেশের হাজারো পর্যটক সবসময় ভীড় জমান কুয়াকাটায় শুধুমাত্র সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার নেশায়। ঢাকা থেকে দুটি পথে আপনি কুয়াকাটায় যেতে পারবেন। একটি হচ্ছে নৌ-পথ আর আরেকটি হচ্ছে সড়কপথ। খাবারের জন্য কুয়াকাটাতে অনেক রেস্টুরেন্ট রয়েছে। দেখার মত অনেক কিছুই কুয়াকাটাতে রয়েছে। সৈকতের খুব কাছেই রয়েছে একটি বৌদ্ধ মন্দির যা আপনার মন কেড়ে নিতে বাধ্য। পাশে রয়েছে রাখাইন মার্কেট। এখান থেকে আপনি  কেনা-কাটা করতে পারেন। এখানে রয়েছ অসম্ভব সুন্দর সব তাঁতের কাজ। আর বার্মিজ আঁচারের পসরা। সৈকতে কিলোমিটার হিসেবে বাইক ভাড়ায় পাওয়া যায়।

 

 

 

খাগড়াছড়ি

মধুচন্দ্রিমার প্রিয়জনের সাথে সময় কাটানোর জন্য আরো একটি গন্তব্য হতে পারে খাগড়াছড়ি। বাংলাদেশে যেসকল সুন্দর জায়গা রয়েছে খাগড়াছড়ি তার মধ্যে অন্যতম। অসংখ্য ঝর্ণা আর পাহাড় মিলিয়ে এক অজানা রহস্যের নাম খাগড়াছড়ি। আপনার হানিমুন পালনের আরেকটি স্থান হতে পারে এই খাগড়াছড়ি। খাগড়াছড়িতে অনেক দর্শনীয় স্থান রয়েছে। এর মধ্যে কিছু উল্লেখযোগ্য স্থান হল- আলুটিলা পর্যটন কেন্দ্র, আলুটিলা গুহা, রিছাং ঝর্ণা, মং রাজবাড়ি, দেবতার পুকুর, বৌদ্ধ মন্দির, দীঘিনালা ঝুলন্ত ব্রীজ, শতবর্ষী বটগাছ ইত্যাদি। সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টির অনন্য নিদর্শন হচ্ছে এই খাগড়াছড়ি জেলা।

 

 

বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার কবিতায় লিখেছিলেন-

“দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া একটি ধানের শিষের উপরে একটি শিশিরবিন্দু।”  নিজেদের দেশের রূপ-বৈচিত্র্য প্রথমে আমাদের নিজেদেরকেই উপলব্ধি করতে হবে। আমাদের দেশের আকর্ষণীয় স্থানগুলোতে যেতে হবে এবং এই সৌন্দর্যের কথা বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরতে হবে। বিয়ের পর সামর্থ্য অনুযায়ী নববধূকে নিয়ে অনেকেই ঘুরতে যায়। একে অপরকে কাছ থেকে চেনা-জানা, সুখে-দুঃখে একে অপরের সঙ্গী হওয়ার প্রাথমিক মহড়া হয়ে যায় হানিমুনে ঘুরতে গিয়ে। দাম্পত্য জীবনের বোঝাপড়া গড়ে তোলার সুবর্ণ সুযোগ মধুচন্দ্রিমা। এই হানিমুনে বিদেশে কোথাও না গিয়ে দেশের অপরুপ সুন্দর জায়গাগুলো থেকেই ঘুরে আসতে পারেন প্রিয়জনের সাথে।

Written by 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *