বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার কবিতায় লিখেছিলেন-

“দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া ঘর হতে শুধু দুই পা ফেলিয়া একটি ধানের শিষের উপরে একটি শিশিরবিন্দু।”  আমরা অনেকেই ঘুরে বেড়াতে পছন্দ করি। কিন্তু এই ঘুরে বেড়ানোর সময় অনেকের যদি একটু আর্থিকভাবে সামর্থ্য থাকে তবে তারা বিদেশভ্রমণ কেই সবার আগে পছন্দ করেন। কিন্তু আমাদের নিজের দেশেই রয়েছে এমন কিছু স্থান যার দর্শন আপনাকে এক ধরণের প্রশান্তিতে ভরিয়ে দিতে পারে। এই লেখাটিতে বাংলাদেশে রয়েছে এমন সুন্দর ২০টি স্থান নিয়ে আলোচনা করব আপনাদের সাথে যা আপনারা সময় করে ঘুরে আসতে পারেন।

 

১। নীলগিরি

বান্দরবান জেলা থেকে প্রায় ৫২ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্ব দিকে বান্দরবান-থানছি সড়কে নীলগিরি পর্যটন কেন্দ্র অবস্থিত। এই পর্যটন কেন্দ্রটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় দুই হাজার ২০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত। পর্যটকরা সহজেই এই জায়গা থেকে মেঘ ছুঁতে পারেন বলে নীলগিরিকে বাংলাদেশের দার্জিলিংও বলা হয়ে থাকে। নীলগিরিতে দাঁড়িয়ে যে দিকে চোখ যায় চোখে পড়বে শুধু সবুজ আর সবুজ। নির্জন প্রকৃতি আর চারপাশে সবুজের সমারোহ নীলগিরির অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। পাহাড়ি আঁকা-বাঁকা পথ দিয়ে বান্দরবান থেকে চাঁদের গাড়ি কিংবা জীপ অথবা মাইক্রো বাসে করে নীলগিরিতে যাওয়া যায়।

নীলগিরি প্রকৃতির এক অনন্য দান। নীলগিরির চূড়া থেকে দাঁড়িয়ে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পাহাড় কেওক্রাডং, বগালেক, কক্সবাজার সমুদ্র, এবং চোখ জুড়ানো পাহাড়ের সারিও দেখতে পাওয়া যায়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটি ক্যাম্প নীলগিরিতে রয়েছে । তাই এখানে নিরাপত্তার কোন ঘাটতি নেই। আপনার যে কোন প্রয়োজনে সেনা সদস্যরা আপনার পাশেই রয়েছে।

 

 

 

২। নীলাচল

 

বাংলাদেশের বান্দরবান জেলার অন্যতম দর্শনীয় স্থান হল নীলাচল। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৬০০ ফুট উঁচু এই জায়গায় বর্ষা, শরৎ এমনকি হেমন্ত— তিন ঋতুতে ছোঁয়া যায় মেঘ। বান্দরবান শহর থেকে মাত্র ছয় কিলোমিটার দূরে টাইগারপাড়া নামক এলাকা। সেখানকার পাহাড়ের চূড়ায় বান্দরবান জেলা প্রশাসন গড়ে তুলেছে আকর্ষণীয় এই পর্যটন কেন্দ্র নীলাচল পর্যটক কমপ্লেক্স।

নীলাচল পর্যটন কেন্দ্রের চূড়ায় পর্যটকদের জন্য রয়েছে বেশ কয়েকটি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র। নীলাচলের মূল পাহাড়ের চূড়ার চারপাশে মনোরম স্থাপনা শৈলীতে নির্মাণ করা হয়েছে এসব কেন্দ্র। একটি থেকে অন্যটি একেবারেই আলাদা। আর একেক দিক থেকে পাহাড়ের দৃশ্যও একেক রকম। বর্ষা পরবর্তী সময়ে এখানে চলে মেঘের খেলা। কিছুসময় পর পর দূর পাহাড় থেকে মেঘের ভেলা ভেসে আসে নীলাচলের চূড়ায়। সাধারণ পর্যটকদের জন্য এ জায়গায় সূর্যাস্ত পর্যন্ত থাকার অনুমতি রয়েছে।

 

 

 

৩। বিরিশিরি

 

নেত্রকোনা জেলার দুর্গাপুর উপজেলার বিরিশিরি ঐতিহ্যবাহী একটি গ্রাম। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপার লীলাভূমি বিরিশিরি। প্রকৃতির ঢেলে দেওয়া অপার সৌন্দর্য এখানে রয়েছে। অনেকে বিরিশিরিকে সাদা মাটির দেশও বলে থাকেন। নদী, পাহাড় আর সবুজে ঘেরা বিরিশিরিতে রয়েছে অনেক কিছু। আপনার ঘুরে দেখার জন্যে দারুণ একটি জায়গা হতে পারে বিরিশিরি। বিরিশিরির প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মধ্যমণি বলা যায় সোমেশ্বরী নদীকে। চারপাশে পাহাড়ে ঘেরা সোমেশ্বরীর উচ্চতা বাড়ার সাথে সাথে এর পানির রং ও পাল্টে যায়। গ্রীষ্মের মৌসুমে এখানে হেঁটে পার হওয়া গেলেও বর্ষায় এটি কানায় কানায় পূর্ণ থাকে। নদী পারাপারের জন্য এখানে নৌকা রয়েছে।

বিরিশিরিতে বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর দেখা পাওয়া যায়। এখানে রয়েছে গারো, মান্দি আর হাজংদের বাস। গারো ও হাজং ব্যতীত প্রায় সবকটি গোষ্ঠীই বাংলা ভাষাভাষি।

এখানে আরো রয়েছে কালচারাল একাডেমি, রাণীখং গির্জা, কমলারাণীর দীঘি, রাজমহল ইত্যাদি।

 

 

 

৪। শ্রীমঙ্গল

 

“চায়ের রাজধানী”র কথা বললেই  শ্রীমঙ্গলের নাম প্রথমে মনে পড়তে বাধ্য। পাহাড়ি এই এলাকায় মাইলের পর মাইল রয়েছে শুধু চা বাগান। বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত মানের চায়ের একটি অংশ শ্রীমঙ্গল থেকে পাওয়া যায় এবং বিদেশে এই চা রপ্তানী করা হয়। এখানে চা বাগানের পাশাপাশি রাবার, লেবু ও আনারসের বাগান রয়েছে। সবুজ প্রকৃতির রূপের কারণে শ্রীমঙ্গলের রয়েছে আলাদা পরিচিতি। শুধু দেশে নয়, বিদেশের পর্যটনপিপাসুদের কাছেও এই জায়গাটি পরিচিত। ফলে বাংলাদেশে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে শ্রীমঙ্গলের অবস্থান একেবারে প্রথম সারিতে রয়েছে। মুক্ত প্রকৃতি এবং নির্মল হাওয়ার জন্য শ্রীমঙ্গল হতে পারে আপনার ঘুরে বেড়ানোর প্রথম পছন্দ। শ্রীমঙ্গলে দেখার মত অনেক স্থান রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু স্থান হল- ক্ষুদ্র জাতিসত্তা পল্লী, শীতেশ বাবুর চিড়িয়াখানা, টি রিসার্স ইনস্টিটিউট, মাধবপুর লেক ইত্যাদি।

 

 

 

৫। বিছানাকান্দি

 

 

বিছানাকান্দি বাংলাদেশের উত্তর পূর্বাঞ্চলের সীমান্তবর্তী উপজেলা গোয়াইনঘাটের রস্তুমপুর ইউনিয়নে অবস্থিত। পাথর, পানি, আকাশ আর পাহাড় নিয়েই যেন তৈরি হয়েছে বিছানাকান্দি। প্রকৃতির সৌন্দর্যের কাছে সবসময় হার মানতেই হয় নাগরিক সভ্যতাকে। আর এই সত্যটুকু গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হলে আপনাকে চলে আসতে হবে বিছানাকান্দিতে। বিছানাকান্দি পর্যটন এলাকাটি মূলত একটি পাথর কোয়েরি।  এখানে নদী থেকে পাথর সংগ্রহ করা হয়।  খাসিয়া পর্বতের বিভিন্ন স্তর এসে একবিন্দুতে এখানে মিলিত হয়েছে। খাসিয়া পর্বত থেকে নেমে আসা একটি ঝর্ণা এখানে একটি হ্রদের সৃষ্টি করেছে যা পিয়াইন নদীর সাথে গিয়ে যুক্ত হয়েছে। এখানকার শিলা-পাথর গুলো একদমই প্রাকৃতিক এবং এগুলো পাহাড়ি ঢলের সাথে পানির মাধ্যমে নেমে আসে। বর্ষার দিনে বিছানাকান্দি পূর্ণ যৌবন লাভ করে। শীতল এই স্রোতধারায় আপনি পেতে পারেন প্রকৃতির মনোরম স্পর্শ।

 

 

৬। করমজল

 

 

সুন্দরবনের পশুর নদীর তীরে করমজল পর্যটন কেন্দ্র অবস্থিত। নৌপথে খুলনা থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার এবং মংলা থেকে আট কিলোমিটার দূরে করমজল পর্যটন কেন্দ্রটির অবস্থান। ইকো ট্যুরিজম কেন্দ্র ছাড়া এখানে রয়েছে কুমির ও হরিণ প্রজনন ও লালন পালন কেন্দ্র। পর্যটন কেন্দ্রের শুরুতেই রয়েছে সুন্দরবনের মানচিত্র, যা আপনাকে সুন্দরবন সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা দেবে।

বাংলাদেশি ছাত্র ও গবেষকরা ২০ ও ৪০ টাকার বিনিময়ে করমজল পর্যটন কেন্দ্রে প্রবেশ করতে পারেন। বিদেশী গবেষকদের প্রবেশের জন্য ৫০০ টাকা দিতে হয়। ভিডিও ক্যামেরা নিয়ে প্রবেশ করতে চাইলে ক্যামেরাপ্রতি অতিরিক্ত টাকা দিতে হবে। বাংলাদেশীদের জন্য এই চার্জ ২০০ টাকা এবং বিদেশি জন্য ৩০০ টাকা।

করমজল পর্যটন কেন্দ্র থেকে আপনি যদি দিনে ফিরে আসেন তবে মংলায় বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের মোটেল পশুরেই আপনি থাকতে পারবেন। এছাড়াও মংলা শহরে সাধারণ মানের বেশ কিছু হোটেল রয়েছে।

 

 

 

৭। ঝুলন্ত সেতু রাঙ্গামাটি

 

পাবর্ত্য চট্রগ্রাম সব সময়ই  ভ্রমণপ্রিয় মানুষদের জন্য আকর্ষণীয় স্থান। পাবর্ত্য জেলা গুলোর পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তা ও মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশ উপভোগ করতে প্রতিবছর দেশ-বিদেশ থেকে প্রচুর দর্শনার্থীরা এখানে ভিড় জমান। এই তিন পার্বত্য জেলার মধ্যে রাঙ্গামাটির আলাদা একটি গুরুত্ব রয়েছে পর্যটনপ্রেমী মানুষের কাছে। পার্বত্য এই জেলাতে রয়েছে বেশ কিছু জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র। কর্ণফুলী হ্রদ, কাপ্তাই পানি বিদ্যুৎ প্রকল্প, পর্যটন মোটেল, ঝুলন্ত সেতু ও কাপ্তাই হ্রদ এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। তবে দর্শনার্থীদের কাছে ঝুলন্ত সেতু ও কাপ্তাই হ্রদ সবচেয়ে জনপ্রিয়। যে সকল পর্যটক রাঙ্গামাটিতে ঘুরতে আসেন তারা ঝুলন্ত সেতুটি না দেখে ফেরত যান না। ৩৩৫ ফুট লম্বা এই ব্রিজটি পর্যটকদের কাছে রাঙ্গামাটির মূল আকর্ষণ। নয়নাভিরাম বহুরঙা এই ঝুলন্ত সেতুটিই দুটি পাহাড়ের মধ্যে গড়ে দিয়েছে সম্পর্ক। সেতুর উপরে দাঁড়ালে কাপ্তাই হ্রদের মনোরম দৃশ্য দেখা যাবে ।সেতুর অপর দিকের পাহাড়ে রয়েছে উপজাতিয়দের গ্রাম। ইচ্ছে হলে দেখে আসতে পারবেন তাদের জীবন-যাপন ও আচার অনুষ্ঠান। সেতুর নিচে কাপ্তাই হ্রদে ঘোরার জন্য রয়েছে ইঞ্জিন চালিত বোটের ব্যবস্থা। দর্শনার্থীরা এ সব বোটে করে ঘন্টা হিসেবে কাপ্তাই হ্রদের পানির সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন।

৮। সাজেক

 

প্রকৃতি সব মানুষকেই কাছে টানে। প্রকৃতির সৌন্দর্যের মধ্যে হারিয়ে যেতে চান না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া খুব মুশকিল। প্রকৃতি প্রেমিকদের যেসব বিষয় আকৃষ্ট করে থাকে তার মধ্যে পাহাড় অন্যতম। আর বাংলাদেশের পাহাড়ের লীলাভূমি হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রাম পরিচিত। পার্বত্য চট্টগ্রামের যেসব দর্শনীয় স্থান পর্যটকদের সব থেকে বেশি আকৃষ্ট করে তার মধ্যে রাঙামাটির সাজেক ভ্যালি অন্যতম। সাজেক ভ্যালি রাঙামাটি জেলার সর্ব উত্তরের ভারতীয় মিজোরাম সীমান্তের পাশে অবস্থিত। আয়তনের দিক থেকে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ইউনিয়ন সাজেক। সাজেকের আয়তন প্রায় ৭০২ বর্গমাইল। সবুজে ঢাকা অপরূপ সাজেকের রাস্তা । সবুজে ঢাকা এই পথ বৃষ্টিতে আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। প্রায়শ এখানে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামে । সবুজ পাহাড়ের চূড়া ঘিরে রয়েছে সাদা মেঘের আবরণ। বর্ষার সময় সাদা তুলোর মতো ছোট ছোট মেঘের স্তুপ ভেসে বেড়ায় এখানে পাহাড়ের বুকে। বৃষ্টির পরে রোদ উঠলে নৈর্সগিক সাজেকে দেখা যায় ডানা মেলে আছে রংধনুর সাত রং।

 

 

 

৯। লাউয়া ছড়া

 

প্রকৃতিপ্রেমী আর ঘুরতে পছন্দ করা মানুষদের জন্য আদর্শ এক স্থান সিলেটের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান । মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলায় জীব বৈচিত্র্যে ভরপুর লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান অবস্থিত । শ্রীমঙ্গল থেকে দশ কিলোমিটার দূরে শ্রীমঙ্গল-ভানুগাছ সড়কের পাশে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের প্রবেশপথ।

বহু পূর্বে লাউয়াছড়া উদ্যানটি আসামের জঙ্গলের সাথে সংযুক্ত ছিল। বন বিনাশ ও অযত্নের ফলে আজ এটি একটি বিচ্ছিন্ন জঙ্গল হিসেবে টিকে আছে। জঙ্গলে ঢুকতেই চোখে পড়বে আকাশ ছোয়া সব গাছ, রাস্তার দুপাশে রয়েছে সারি সারি টিলা। প্রচুর বৃষ্টিপাত এই এলাকায় হয়, এখানে আপনি অসংখ্য পাখির ডাক শুনতে পারবেন, মাঝে মাঝে দেখা মিলবে নানা প্রজাতির বানরের, ভাগ্য যদি ভাল থাকে পেয়ে যেতে পারেন বিপন্ন প্রায় উল্লুকের দেখা। জঙ্গলের ভেতরে দেখা পেতে পারেন এখানে বসবাসকারী আদিবাসী খাসিয়া, টিপরা অথবা মনিপুরীদের।

২৭৪০ হেক্টরের আয়তন বিশিষ্ট এই বনে জীববৈচিত্র্য বিস্ময়কর রকমের সমৃদ্ধ। এখানে প্রায় ১৫৯ প্রজাতির গাছপালা পাওয়া যায়, আরো পাওয়া যায় বন মোরগ, হরিয়াল সহ প্রায় ১২০ রকমের পাখি। স্তন্যপায়ীদের মধ্যে এখানে পাওয়া যায় লজ্জাবতী বানর,শূকর লেজী বানর, আসামী বানরসহ ৬ প্রজাতির বানর, কাঠবেড়ালী, বন বেড়াল, খাটাশ, শূকর, সোনালী শেয়াল,মায়া হরিণ এছাড়া নানা রকমের সরিসৃপ ও সাপ এখানে পাওয়া যায়। পূর্বে এই জঙ্গলে বাঘ, চিতাবাঘ, প্রভৃতির দেখা পাওয়া যেত।

 

 

 

১০। জাফলং

 

 

জাফলং সিলেট জেলার গোয়াইনঘাট উপজেলার অন্তর্গত একটি এলাকা। সিলেট শহর থেকে জাফলং ৬২ কিলোমিটার উত্তর-পূর্ব দিকে অবস্থিত। দেশের অন্যতম একটি পর্যটনস্থল হিসেবে জাফলং বাংলাদেশের সকলের কাছে পরিচিত। মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতের সাথে সীমান্তবর্তী হওয়ার কারনে জাফলং এলাকা গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা পালন করেছে। সিলেটের সাথে আশির দশকে জাফলং এর ৫৫ কিলোমিটার সড়ক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠিত হয়। দেশী-বিদেশী পর্যটকদের পাশাপাশি এরপর থেকে প্রকৃতিপ্রেমীরাও ভিড় করতে থাকেন জাফলংয়ে। পাথরের জন্য জাফলং অনেক বিখ্যাত। পাথর উত্তোলন ও তা প্রক্রিয়াজাতকরণকে ঘিরে এই এলাকার মানুষের এক বৃহৎ অংশের জীবিকা গড়ে উঠেছে । এখানে বাঙালিদের পাশাপাশি উপজাতিরাও বাস করে।  জাফলং এ দাঁড়িয়ে ভারতের মেঘালয় আপনি দেখতে পাবেন। পাহাড় থেকে নেমে আসা ঝর্ণা জাফলং-এ ঘুরতে আসা পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ। এখানকার নদীর পানি অনেক স্বচ্ছ। তাই নদীর গভীরে কি আছে দেখা যায়।

 

 

১১। মাধবকুন্ড

 

 

দুটি পাতা আর একটি কুড়ির দেশ সিলেট। আর এই সিলেট বিভাগের একটি জেলার নাম হচ্ছে মৌলভীবাজার। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর মাধবকুন্ড,  মৌলভীবাজার জেলার বড়লেখা উপজেলায় অবস্থিত। মাধবকুন্ড দেশের সর্ববৃহৎ জলপ্রপাত। প্রায় ৮৫ মিটার উচু পাথরের খাড়া পাহাড় হতে শোঁ শোঁ শব্দ করে জলধারা নিচে আছড়ে পড়ে মাধবকুন্ডে। ঝর্নার পানি নিচে পড়ে ছোট বড় বিভিন্ন পাথরের ফাঁক গলে মিশে যাচ্ছে বড় একটি ছড়াতে। ঝর্নার সম্মুখের বড় পাথরে বসে বসে এ দৃশ্য দেখতে পাওয়া সত্যিই খুব উপভোগ্য। মূল জলপ্রপাতের বাম পাশে ২০০ গজ দূরে পরিকুণ্ড নামের আরও একটি জলপ্রপাতের সৃষ্টি হয়েছে। সেখান থেকেও অনবরত পানি পড়ছে। কিন্তু সেখানে একটু কষ্ট করে যেতে হয়।

 

 

 

 

১২। বগালেক

 

 

বান্দরবানে যে কয়েকটি দর্শনীয় স্থান রয়েছে বগালেক তার মধ্যে অন্যতম। সমুদ্র সমতল হতে ১৭০০ ফুট উপরে পাহাড়ের চূড়ায় প্রায় ১৫ একর জায়গা জুড়ে এই অত্যাশ্চর্য হ্রদটি বিস্তৃত। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ উচ্চতার স্বাদু পানির একটি হ্রদ এই  বগা লেক। স্থানীয়রা এটিকে  ‘ড্রাগন লেক’ নামে ডেকে থাকে। বান্দরবনের রুমা উপজেলায় বগা লেক অবস্থিত। ভূমিধসের কারণে এটির সৃষ্টি হয়েছে বলে অনেকের ধারণা । রুমা বাজার থেকে চাঁদের গাড়ি অথবা পায়ে হেঁটে প্রাকৃতিক এই লেকে যাওয়া যায়। বগা লেক ভ্রমণকারীদের জন্য গড়ে তোলা হয়েছে ছোট ছোট বেশ কয়েকটি কটেজ।সকাল, সন্ধ্যা অথবা রাত প্রতি বেলাতেই বগালেক নতুন নতুন রূপ ধারণ করে।

 

 

 

১৩। কক্সবাজার

 

চট্টগ্রাম বিভাগের অন্তর্গত একটি জেলা হচ্ছে কক্সবাজার। এটি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্হিত।  কক্সবাজার চট্টগ্রাম থেকে ১৫২ কিঃমিঃ দক্ষিণে অবস্হিত। ঢাকা থেকে কক্সবাজার এর দূরত্ব ৪১৪ কি.মি.। বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজারে অবস্থিত। কক্সবাজার গেলে দিনের যেকোন সময় সমুদ্রতীরে বেড়াতে আপনার মন চাইবে। বালুর নরম বিছানা, সারি সারি ঝাউবন, সামনে বিশাল সমুদ্র এর দেখা পেতে হলে আপনাকে যেতে হবে কক্সবাজার ।

কক্সবাজার থেকে ১২ থেকে ২২ কিলোমিটার দূরত্বের মধ্যেই রয়েছে আরো দুটি পর্যটন স্থান। একটি হলো ইনানী এবং অন্যটি হলো হিমছড়ি । কক্সবাজার থেকে ২২ কিলোমিটার দূরে রয়েছে আকর্ষণীয় সমুদ্র সৈকত ইনানী । আর এই সৈকতে যাওয়ার পথেই পাওয়া যাবে আরেক আকর্ষণীয় পর্যটন স্থান হিমছড়ি।

বিশ্বের সর্ববৃহৎ বিচ কক্সবাজারে রয়েছে আন্তর্জাতিকমানের বেশ কয়েকটি হোটেল ও রিসোর্ট। এছাড়াও সরকারি এবং ব্যক্তিগত মালিকানায় এখানে ছোট বড় বিভিন্ন মানের অনেক রিসোর্ট, হোটেল ও বোর্ডিং হাউস গড়ে উঠেছে ।

 

 

 

১৪। সেন্ট মার্টিনস

 

সেন্টমার্টিন বাংলাদেশের সীমানার সর্ব দক্ষিণে অবস্থিত।  কক্সবাজার জেলার টেকনাফ উপজেলা থেকে সেন্টমার্টিন ৯ কিমি দক্ষিণে গড়ে ওঠা একটি ছোট দ্বীপ। ভ্রমণ পিপাসু মানুষদের অবসর সময় কাটানোর জন্যে এবং পরিবারের সাথে একান্তে সময় কাটানোর জন্যে আদর্শ জায়গা হচ্ছে এই সেন্টমার্টিন দ্বীপ। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে প্রতি বছর হাজার হাজার পর্যটক সেন্টমার্টিন দ্বীপে ঘুরতে আসেন। সেন্টমার্টিন দ্বীপে থাকার জন্যে উন্নতমানের বেশ কয়েকটি হোটেল ও কটেজ রয়েছে। আপনি আপনার পছন্দ মত যেকোন হোটেলেই থাকতে পারেন। তবে পর্যটন মৌসুমে সেন্টমার্টিন দ্বীপে আসার আগেই কোন হোটেল বা কটেজে আপনি বুকিং দিয়ে রাখতে পারেন। নাহলে আপনি হয়ত তখন কোথাও থাকার জায়গা নাও পেতে পারেন। কারণ পর্যটন মৌসুমে প্রচুর পরিমাণে জনসাধারণের সমাগম ঘটে সেন্টমার্টিন দ্বীপে।

 

 

 

 

১৫। নিঝুম দ্বীপ ন্যাশনাল পার্ক – হাতিয়া

 

শহরের ব্যস্ত জীবন থেকে মুক্তিলাভের জন্য যদি প্রকৃতির ভূস্বর্গে আপনি হারিয়ে যেতে চান। তবে ঘুরতে যেতে পারেন নিঝুম দ্বীপ। চারদিকে গাছপালা আর ঘন জংগল পরিবেষ্টিত প্রকৃতির এক অপরূপ সুন্দর দ্বীপ হচ্ছে এই নিঝুম দ্বীপ । শীতকালে বিভিন্ন দেশ থেকে হাজারো অতিথি পাখির এক মিলনমেলা বসে এখানে। নিঝুম দ্বীপ নোয়াখালী জেলার হাতিয়া উপজেলায় অবস্থিত। নিঝুম দ্বীপে কোন হিংস্র প্রাণি নেই এখানে সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায় হরিণ ও মহিষ। বাংলাদেশের প্রকৃতির বিস্ময়কর সুন্দর রূপ দেখার জন্য এখানে আসতেই পারেন।

 

 

 

১৬। কুয়াকাটা

 

বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের একটি সমুদ্র সৈকত ও পর্যটনকেন্দ্র হচ্ছে কুয়াকাটা। আপনার ভ্রমণের আরো একটি গন্তব্য হতে পারে এই কুয়াকাটা। কুয়াকাটা বাংলাদেশের একমাত্র সৈকত যে জায়গা থেকে সূর্যোদয় এবং সূর্যাস্ত দুটোই দেখা যায়। দেশ বিদেশের হাজারো পর্যটক সবসময় ভীড় জমান কুয়াকাটায় শুধুমাত্র সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার নেশায়। ঢাকা থেকে দুটি পথে আপনি কুয়াকাটায় যেতে পারবেন। একটি হচ্ছে নৌ-পথ আর আরেকটি হচ্ছে সড়কপথ। খাবারের জন্য কুয়াকাটাতে অনেক রেস্টুরেন্ট রয়েছে। দেখার মত অনেক কিছুই কুয়াকাটাতে রয়েছে। সৈকতের খুব কাছেই রয়েছে একটি বৌদ্ধ মন্দির যা আপনার মন কেড়ে নিতে বাধ্য। পাশে রয়েছে রাখাইন মার্কেট। এখান থেকে আপনি  কেনা-কাটা করতে পারেন। এখানে রয়েছ অসম্ভব সুন্দর সব তাঁতের কাজ। আর বার্মিজ আঁচারের পসরা। এখানে সৈকতে কিলোমিটার হিসেবে বাইক ভাড়ায় পাওয়া যায়।

 

১৭। পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত

 

সাগরের অপরুপ সৌন্দর্য্য যাদের সবসময় হাতছানি দিয়ে ডাকে তারা ঘুরে আসতে পারেন পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত থেকে। চট্টগ্রাম শহরের ১৪ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত পতেঙ্গা একটি সমূদ্র সৈকত। কর্ণফুলী নদীর মোহনায় পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত অবস্থিত। চট্টগ্রাম শহরের একটি জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত । এখান থেকে বঙ্গোপসাগর দেখা যায়। রাতের বেলা এর সৌন্দর্য উপভোগের মজাই আলাদা। মধ্যরাত পর্যন্ত পর্যটকের কোলাহলে মুখরিত থাকে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত।এখানে সুটকি মাছ, এবং বিভিন্ন সামুদ্রিক হস্ত শিল্প সামগ্রী পাওয়া যায়। চট্টগ্রাম শহরে ঘুরতে গিয়ে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত না দেখে ফিরলে পুরো চট্টগ্রাম ভ্রমনটাই বৃথা। পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে পৌঁছার আগে আনুমানিক ২ কিলোমিটার দীর্ঘ রাস্তার দুই পাশে ঝাউগাছের সারি চোখে পড়বে।

 

 

১৮। মনপুরা

 

মনপুরা দ্বীপ হচ্ছে বাংলাদেশের বঙ্গোপসাগর এলাকার উত্তরদিকে মেঘনা নদীর মোহনায় অবস্থিত একটি দ্বীপ। ভোলা জেলার মনপুরা উপজেলায় এটি অবস্থিত। ভোলা সদর থেকে প্রায় ৮০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পূর্ব দিকে মনপুরা দ্বীপ অবস্থিত। মনপুরার সবচেয়ে আকর্ষণীয় হচ্ছে এর ম্যানগ্রোভ বাগান। এখানে রয়েছে ছোট বড় ১০টি চর। এখানে বনবিভাগের প্রচেষ্টায় হয়েছে সবুজের বিপ্লব। মাইলের পর মাইল সবুজ বৃক্ষরাজি মনপুরাকে যেন সাজিয়েছে সবুজের সমারোহে। শীত মৌসুমে শত শত পাখির কলকাকলিতে মুখরিত থাকে এই মনপুরা দ্বীপ।যোগাযোগ ব্যবস্থা মনপুরার সবচেয়ে বড় সমস্যা। ঢাকা অথবা বরিশাল থেকে ভোলা হয়ে তজুমুদ্দিন সি-ট্রাক ঘাট থেকে মনপুরায় আসা যায়। মনপুরা দ্বীপ বর্তমানে দেশীয়দের পাশাপাশি বিদেশি পর্যটকদের কাছেও অনেক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।

১৯। মহাস্থানগড়

 

বাংলাদেশের একটি অন্যতম প্রাচীন পুরাকীর্তি মহাস্থানগড়। বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ উপজেলায় মহাস্থানগড়ের অবস্থান। পূর্বে এর নাম ছিল পুণ্ড্রনগর। বগুড়া শহর থেকে ১৩ কি.মি উত্তরে করতোয়া নদীর পশ্চিম তীরে মহাস্থান গড় অবস্থিত। মহাস্থানগড় এক সময় বাংলার রাজধানী ছিল। ২০১৬ সালে মহাস্থানগড়কে সার্কের সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবে ঘোষনা করা হয়।  প্রাচীর বেষ্টিত এই নগরীর ভেতরে  বিভিন্ন আমলের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন রয়েছে । কয়েক শতাব্দী পর্যন্ত পরাক্রমশালী মৌর্য, গুপ্ত, পাল ও সেন শাসকবর্গের প্রাদেশিক রাজধানী ও পরবর্তীকালে হিন্দু সামন্ত রাজাদের রাজধানী ছিল এই মহাস্থানগড়। বাংলাদেশের অন্যতম একটি প্রাচীন পর্যটন কেন্দ্র হল এই মহাস্থানগড়। এখানে বহু দর্শনীয় স্থান রয়েছে।

 

 

২০।  লালবাগ কেল্লা

 

ঢাকা শহরের পুরান ঢাকার লালবাগ এলাকায় ঐতিহাসিক লালবাগ কেল্লা অবস্থিত। লালবাগ কেল্লার আসল নাম ছিল কিল্লা আওরঙ্গবাদ। ১৬৭৮ সালে সম্রাট আওরঙ্গজেবের ৩য় পুত্র, মুঘল রাজপুত্র আজম শাহ এটার নির্মাণকাজ শুরু করেন। দুর্গের নির্মাণকাজ শেষ হবার আগেই মারাঠা বিদ্রোহ দমনের জন্য তাকে এখান থেকে চলে যেতে হয়। পরবর্তীতে সুবেদার শায়েস্তা খাঁ ১৬৮০ সালে পুনরায় বাংলার সুবেদার হিসেবে ঢাকায় এসে দুর্গের নির্মাণকাজ পুনরায় শুরু করেন। এখানে শায়েস্তা খাঁর কন্যা ইরান দুখত রাহমাত বানুর মৃত্যু হয়। কন্যার মৃত্যুর পর শায়েস্তা খাঁ এ দুর্গটিকে অপয়া মনে করেন এবং ১৬৮৪ খ্রিস্টাব্দে এর নির্মাণকাজ অসমাপ্ত অবস্থায় বন্ধ করে দেন। লালবাগের কেল্লার অন্যতম একটি স্থাপনা হল পরী বিবির সমাধি।

নিজেদের দেশের রূপ-বৈচিত্র্য প্রথমে আমাদের নিজেদেরকেই উপলব্ধি করতে হবে। আমাদের দেশের আকর্ষণীয় স্থানগুলোতে যেতে হবে এবং এই সৌন্দর্যের কথা বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরতে হবে। উপরোক্ত স্থানগুলো হতে পারে আপনার ঘুরে বেড়ানোর জন্যে আদর্শ কিছু জায়গা।

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ এবং সবুজে শ্যামলে ছাওয়া দেশ, উপভোগ করুন বাংলার সৌন্দর্য

Written by 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *